সালমানের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিল: সামিরা

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম সালমান শাহ। নব্বই দশকে যার আগমন ঘটেছিল ধূমকেতুর মত। তারা হয়ে আলো জ্বালাতে এসে সবার মন জয় করে অল্পতেই নিভে যায় সালমান নামের সেই আলো। তার অকাল প্রয়াণ মেনে নিতে পারেনি শোবিজ অঙ্গন ও তার ভক্তরা। সালমানকে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন সেই বিষয়ে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

সম্প্রতি প্রকাশিত সেই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয় যে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর সেটি প্রত্যাখানও করেছেন সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী। শুধু তাই নয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন এমনটা তার সহকর্মী কিংবা ভক্তরা কেউই মেনে নিতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা। এই বিষয়ে সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা হক জানালেন শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নানান কথা।

পিবিআইয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর এটি নিয়ে নানামুখি আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে সামিরা বলেন, শুধু এটা কেন, এর আগে চারবার বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে আত্মহত্যাই এসেছে। কারণ আমি সেই ৯৬ সাল থেকেই বলে আসছি। আমার চেয়ে তো আর বেশি কেউ জানে না। কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ইমনের (সালমান শাহ) মা, ভাই ও কুমকুম মামা অপরাধী করেছেন। যা তা গল্প বানিয়ে সবার সামনে আমাকে অত্যন্ত বাজেভাবে খুনি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। অনেক পরে এসে আবারও সেটাই প্রমাণ হয়েছে যা আমি বলেছি যে সালমান আত্মহত্যা করেছে। শুধু আমি নই, যারা ওইদিন ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন সবাই এটাই বলে আসছেন।

ইমনের পরিবার একেকবার একেক কথা বলেছে। তারা গল্প বানিয়েই গেছে। তাদের যে কথা ইমনের মৃত্যুর দিন ছিলো সেটা এক মাস পর অন্য রকম হয়েছে। পরের বছর আরও অন্যরকম হয়েছে। কাল পর্যন্ত তারা নতুন নতুন বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু আমি পুলিশের কাছে জবানবন্দিতে তাই বলে এসেছি যা ১৯৯৬ সালে বলেছিলাম। কারণ আমি কোনো গল্প বানাইনি।

তবে যেটা ভালো লেগেছে পিবিআই মামলাটিকে দারুণভাবে বিশ্লেষণ করেছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটাকে হ্যান্ডেল করে সবার সামনে প্রেজেন্ট করেছে। এর সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাইকে জড়ো করে তাদের জবানবন্দি নিয়েছে নতুন করে। সবার বক্তব্য, আলামত, বিভিন্ন রিপোর্ট আমলে নিয়ে খুঁটিনাটি সব তুলে এনে তারপর প্রতিবেদন করেছে। তারা ভিডিও করে জিনিসটা প্রেজেন্ট করেছেন। এখানে অনেক কিছু নতুন তথ্য এসেছে। যা আমারও জানা ছিলো না। সবার জবানবন্দি নেয়ার কারণেই পিবিআই অনেক ইনফরমেটিভ একটি রিপোর্ট তৈরি করতে পেরেছে। এজন্য আমি কৃতজ্ঞতা জানাই পুলিশের এই সংস্থার প্রতি।

পিবিআইয়ের তদন্তে সালমান শাহ আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ‘অতি-অন্তরঙ্গতা’। এ বিষয়ে সামিরা বলেন, ‘ইমন (সালমান শাহ) ও শাবনূর প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং সেই কথা ইমন নিজেই আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু এখন শাবনূর ভিন্ন কথা বললে তো হবে না। শাবনূর যা করেছে, তাঁর কৃতকর্মের জন্য তাঁকে সরি বলতে হবে। সেটা এখন হোক কিংবা পরে, এই জীবনে কিংবা শেষ বিচারের দিনে।’

এদিকে পিবিআইয়ের এমন তদন্তের পর সালমান শাহের পরিবার এটা প্রত্যাখান করেছেন। তারা এটা মানেন না বলে জানিয়েছেন, উচ্চ আদালতেও যাবেন বলেছেন। এই বিষয়ে সামিরা বলেন, তারা কিছুই মানবে না। আর তারা যদি না মানে এতে করে সত্য তো মিথ্যা হয়ে যাবে না। এটা আমি আগেও বলেছি, দেশের আইন ব্যবস্থার উপর তাদের ভরসা নেই।

তারা কিছুই মানেন না। ডিবি, সিআইডি, জজকোর্ট এবার পিবিআই। সবাই মিথ্যে বলছে। আমি সবাইকে কিনে ফেলেছি? এই ২৪ বছরে সরকার বদলেছে বারবার, কত অফিসারের মৃত্যু হয়ে গেল, কতজন নতুন এলেন। সবাইকে আমি বশ করে ফেলেছি? এটা বিশ্বাসযোগ্য? নীলা চৌধুরী আইনের সমালোচনা করেন, আইনের সংস্থাকে নাটক বলেন। পৃথিবীর যে প্রান্তে গিয়েই তদন্ত করা হোক না কেন সত্য কখনোই বদলে যাবে না।

তিনি তো অনেক চেষ্টাই করলেন। কত গল্প বানালেন, আমাকে দুনিয়ার লোকের সঙ্গে প্রেম করালেন। ফটোশপের কারসাজিতে এর সঙ্গে বসালেন, ওর সঙ্গে শুয়ালেন। একটাও প্রমাণ হয়নি। কারণ মিথ্যেকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। আমার কষ্ট হয়, কেমন করে পারলেন তিনি এতকিছু? আমি না তার ছেলের বউ ছিলাম। আমি তো সালমানের সঙ্গে সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতাম। সিনেমার মানুষেরা তার সাক্ষী। তাছাড়া ইস্কাটনের বাসাতে অনেক সিকিউরিটি ছিলো, কাজের লোকজন ছিলো। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এত প্রেম আমি করলাম কখন? সালমান কিছুই জানতো না? আর কেন করবো? সেই সময়ের হার্টথ্রব পুরুষটি আমার স্বামী, আর কোনো পুরুষে আমার দৃষ্টি আসবে কেন? আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে আমি চিনতাম না। নীলা চৌধুরী চিনতেন। তিনি আরও অনেককেই চিনতেন।

সালমান আমার প্রেমিক, সালমান আমার স্বামী। আজও মানুষ নায়ক সালমানকে যেমন মনে রেখেছে, আমিও আমার জীবনের সেরা মানুষটিকে মনে ধারন করে রেখেছি। যাকে এখন বিয়ে করেছি সে এটা জেনে ও মেনেই আমাকে বিয়ে করেছে। কে বিশ্বাস করলো না করলো তাতে কিছুই যায় আসে না। চিৎকার করে লোক দেখিয়ে আমার ভালোবাসা আমি কোনোদিন প্রচার করিনি।

সালমান হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি ছিলেন আপনি। এই প্রতিবেদন সেই অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। এটা নিশ্চয়ই স্বস্তির। সামিরার ভাষ্য, এই ২৪ বছরে যে গ্লানি, অপবাদ আমি বয়ে বেড়িয়েছি সেটা একজন নারী হিসেবে কতটা কষ্টের, কতটা অমানবিক ছিলো তা কাকে বোঝাবো? চোখের সামনে স্বামীকে হারালাম যাকে এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে বিয়ে করেছিলাম। সেই স্বামীর খুনের অভিযোগ মাথায় নিলাম। একজন নারী হয়ে আমার শাশুড়ি আমার জীবনটাকে বিষিয়ে দিয়েছেন। এটা কি ঠিক হলো? এর বিচার কে করবে? এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিটা রাত, প্রতিটা দিন আমি নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। একটা সংসার আছে আমার, তিনটা বাচ্চা আছে। তারা হেয় হয়েছে, তাদের কাছে আমি ছোট হয়েছি। সমাজে আমি ছোট হয়েছি। সালমান ভক্তদের কাছে আমি ছোট হয়ে চলেছি। তবুও আমি ধৈর্যশালী ছিলাম। কারণ আজ কিংবা কাল, সত্যিটা সত্যিই হয়।

এবং সেটাই হয়েছে। সালমানের মা ও পরিবারের অন্যদের ষড়যন্ত্র এবং উদ্দেশ্য সবাই বুঝতে পারছে। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের পর অসংখ্য ভক্তরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তারা উপলব্ধি করছে যে সালমান সত্যি খুন হলে বারবার সেটা আত্মহত্যা হয়ে আসতো না। আমি এমন কেউ নই যে দেশের সবাইকে কিনে নেবো। এখানে এমন অনেকের বক্তব্য নেয়া হয়েছে যাদের কথা আমিও জানতাম না। এসব বিষয় সবাইকে ভাবাচ্ছে৷ সবাই সত্যটা বুঝতে পারছেন। প্রিয় নায়ক আত্মহত্যা করেছেন এটা মানতে কষ্ট হলেও তারা বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন। এটা ভালো লাগছে।

সালমান শাহের মৃত্যুর পর আপনি মিডিয়ায় আসেননি কখনো। যার কারণে সবসময় সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে একতরফা কথা শোনা গেছে। এজন্যই অনেক তথ্যের গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এইটা সালমান ভক্তদের কাছে আপনাকে খুনি বা অভিযুক্ত হিসেবে আরও বেশি প্রতিষ্ঠা করেছে বলে মনে হয় না? এমন প্রশ্নে সামিরা বলেন, আমি কখনো চাইনি এটা। মিডিয়ার সামনে কথা না বলার কিছু কারণ আছে।

এক, আমি চাইনি সালমানকে খাটো করতে। আমাকে কে ভালোবাসলো না বাসলো তা নিয়ে আমি ভাবি না। আজও ভাবি না। কিন্তু সবাই সালমানকে ভালোবাসছে এটা আমার ভালো লাগে। তাই চুপ থেকেছি। কারণ কথা বলতে গেলেই অনেক কথা বাড়ে। এই যে এখন সবাই শাবনূরকে টেনে এনে সালমানের চরিত্র নিয়ে নানারকম সমালোচনা করছে। এটা আমি চাইনি কোনোদিন। কিন্ত মা হয়ে, ভাই হয়ে তারা চেয়েছে। আত্মহত্যা জেনেও এটা নিয়ে নাটক বানিয়েছে, একবার দাফন করা লাশ আবার উঠিয়েছে। একবারের রিপোর্ট বারবার করিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে সালমানকে সমালোচনার পাত্র বানিয়েছে। এটা তাদের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। আমি কোনোদিন চাইনি। যা হয়েছে মেনে নিয়েছিলাম। সালমান আমাকে সরি বলেছিলো, আমি সব ভুলে তার সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলাম। শাবনূরকেও ক্ষমা করে দিয়েছি। কোথাও একটি কথাও আমি বলিনি সালমান-শাবনূরের সম্পর্ক নিয়ে। শাবনূরকে নিয়ে একটা অভিযোগও তুলিনি আমি। আমি চাইনি এসব নিয়ে আলোচনা হোক।

দুই, মিডিয়া চিনেছি আমি ইমনের হাত ধরে। সে চলে যাবার পর এই মিডিয়া আমি আর নিতে পারিনি। ইমনের মায়ের কথামতো মিডিয়া আমাকে নিয়ে তথ্য প্রমাণ ছাড়াই এত বাজেভাবে লিখেছে যা আমি নিতে পারিনি।

তিন, আমার আইনজীবী সবসময় না করেছেন মিডিয়াতে না আসতে৷ এটা নিয়ে মামলার ঝামেলা হতে পারে তাই।

সালমান শাহের বাবা-মা ও ভাই গ্রিন রোডে থাকতেন। কিন্তু আপনারা ইস্কাটনে আলাদা থাকতেন। সেটা কেন? সামিরার জবাব, এই বিষয়টা আমি কখনও শেয়ার করতে চাইনি মিডিয়াতে। কারণ আমাকে ছোট করলেও আমি সালমানের মা হিসেবে নীলা চৌধুরীকে কখনো কারো কাছে ছোট করতে চাইনি। সে আমার নামে যত বাজে কথা ছড়িয়েছে আমি কিন্ত তাকে নিয়ে কোনো টিভি-রেডিওতে গিয়ে কুৎসা রটাইনি। বললে বলার শেষ হবে না। আজ যখন প্রসঙ্গটা আসলো তাই বলছি। নীলা চৌধুরী আমার গায়ে হাত তুলেছিলেন। তখন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘স্নেহ’ ছবির শুটিংয়ে বান্দরবান ছিলো সালমান।

আমাকে মারধরের খবর পেয়ে বিনা নোটিশে একদিনের জন্য ও ঢাকায় ছুটে এসেছিলো। গাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেই এটা জানতে পারবেন। আমি রেফারেন্স দিয়ে কথা বলছি। বানিয়ে নয়। সালমান ঢাকায় এসে দেখলো আমি বাসায় পড়ে কান্নাকাটি করছি। তার মা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ছেলেকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করতে। সালমান কিন্তু তার নাটক বিশ্বাস করেনি। সবার কাছে ঘটনা শুনে সে বিরক্ত হলো। এরপর আলাদা হয়ে আমাকে নিয়ে ইস্কাটনের বাসায় উঠলো।

সেখানে খুব একটা আসতেন না নীলা চৌধুরী। সবমিলিয়ে হয়তো চারবার এসেছেন। তবে আমার শ্বশুর আসতেন প্রায়ই। তিনি আমাকে খুব আদরও করতেন। মা বলে ডাকতেন। আমিও তাকে কোনোদিন অশ্রদ্ধা করিনি।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদন নিয়ে সালমানের মা আপত্তি জানিয়েছেন। এটাকে নাটক বলেছেন। তার দাবি আপনি ও পিবিআই মিলে মনগড়া নাটক বানিয়েছেন বিচারের নামে। এ বিষয়ে কী বলবেন? সামিরার উত্তর,সালমান যদি আত্মহত্যাও করে থাকেন তবে সেটা শাবনূর এবং আপনার দোষ। নীলা চৌধুরী এমনটাই বলে আসছেন সবসময়। সামিরা বলেন, তিনি আমাকে গ্রেপ্তার দেখাতেই চান। আমাকে সরিয়ে সালমানের সবকিছু ভোগ করছেন। আমার নামে বনানীতে ফ্ল্যাট কিনেছিলো সালমান, আমাকে লাল রঙ্গের একটা গাড়ি গিফট করেছিলো বিয়েবার্ষিকীতে। সেগুলো কই? কেউ কিছু বলার নেই। ইচ্ছেমতো সব ভোগ করা যাচ্ছে। আমি এতো খারাপ হলে আমাকে ছোট ছেলেকে দিয়ে বিয়ে করিয়ে রাখতে চান কেন? একটা রেডিওতে তিনি বলেছেন, আমাকে সালমানের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে রেখে দিতে চেয়েছিলেন। আমি তো খারাপ। তাহলে কেন এমনটা ভাবেন। আর সালমানের ছোটভাই আমার পাঁচ বছরের ছোট। তিনি কেমন করে এ ধরনের ভাবনা ভাবেন।

তবে পয়েন্ট হলো তিনি এখন এটাকে আত্মহত্যা বলে মানতে শুরু করেছেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন এটা আত্মহত্যাই। কিন্তু তিনি এটা নিয়ে জল ঘোলা করতে চেয়েছেন, আমাকে ও আমার পরিবারকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারতে। কারণ তার কথা না মেনেই ইমন আমাকে বিয়ে করেছিলো। তার শোধ নিচ্ছেন তিনি। তার কথা হলো যে কোনোভাবেই হোক আমাকে অপরাধী করা। নতুন করে শাবনূরের নাম যোগ করেছেন। কারণ এখন পিবিআই বলে দিয়েছে শাবনূরের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে চাপে ছিলো সালমান। আসলে সেই ১৯৯৬ সাল থেকেই তিনি আসামীর তালিকা বাড়িয়ে চলেছেন। তার কথার কোনো ঠিক নেই, স্থিরতা নেই।

অনেকেই বলছেন সালমানের আত্মহত্যা দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই নি কেন! আমার কথা হলো, কেন সেন্সলেস হবো আমি। স্বামী মারা যাচ্ছে দেখে কী বউরা সেন্সলেস হয়ে যায়? নাকি সেটা সামলানোর চেষ্টা করে, সবাইকে ডেকে আনার চেষ্টা করে?

আর আমি কেন সেন্সলেস হবো? এখানে সেন্সলেস মানে কী আমাকে অজ্ঞান হয়ে যেতে হবে? ইমনের মামা হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন আমি স্বাভাবিক ছিলাম। ডাহা মিথ্যা কথা। দরজা খোলে ইমনকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেই তো আমি আতংকে চিৎকার-কান্নাকাটি শুরু করলাম। প্রশ্ন উঠেছে কেন ডাক্তার ডাকিনি, হাসপাতালে নিয়ে যাইনি। তখনও তো ভাবিনি যে ইমন আর নেই। তাকে নামিয়ে সবাই চেষ্টা করছিলাম জ্ঞান ফেরানোর।

আর ডাক্তার ডাকিনি কে বললো? বাসায় কোনো ল্যান্ডফোন ছিলো না। যে ফোনটা ছিলো সেটাও রাতে ইমন ভেঙে ফেলেছিলো। সাথে সাথে কাউকে ফোন করে ডেকে আনার উপায় তো ছিলো না। এগুলো তো কমন বিষয়। তারা জানেন না? নাকি বুঝেন না। আমার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকরা ছুটে এলো। কেউ নিচে গিয়ে একজন ডাক্তারকে ডেকে আনলো। ইমনের বাবা-মায়ের কাছে খবর দেয়া হলো। উনারা এলেন।

আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না এটা কেমন করে বলেন তারা? ওই রুমে কম করে হলেও ২৫ জন মানুষ ছিলো। যখন ইমনের বাবা, মা ও ছোট ভাই এলো তখন আমার কোলে ইমনের মাথা। আমি চিৎকার করে কাঁদছি। আমাকে কেউ স্বান্তনা দেয়নি। আমার শ্বশুর-শাশুরিও না। শাশুরি আমার পিছন দিক থেকে রুমে ঢুকেই আমার পিঠে একটা লাথি মারেন। অকথ্য ভাষায় গালি দিতে শুরু করেন। ইমনের ছোট ভাই সেও তো ধমকাধমকি করলো। সেই ঘটনা কাজের লোক ও উপস্থিত সবার সামনে ঘটেছে। পিবিআইয়ের কাছে জবানবন্দীতে অনেকে বলেছেও এই কথা।

তাদের সন্তান-ভাই হারিয়েছে, আর আমার? আমার তো স্বামী গেল। ২২ বছরের একটা মেয়ে বিধবা হলাম। কেউ কী সেদিন আমার কষ্টটা বুঝতে চেষ্টা করেছিলো। উল্টো রঙ চঙ মাখিয়ে আমাকে মক্ষীরানী সাজিয়ে দেশবাসীর কাছে স্বামীর খুনী হিসেবে পরিচয় করানো হলো। ২৪ বছর ধরে আমার সঙ্গে যে অবিচারটা করা হলো তার বিচার কে করবে? একজন নারী হিসেবে আমার এই লড়াইটা, সংগ্রামটা কেউ কী অনুধাবন করতে পারবেন? যারা কোনো তথ্য প্রমাণ না পেয়েই কেবল গল্প আর মনগড়া তথ্যের আবেগে ভেসে আমার শাস্তি চেয়ে আন্দোলন করেছেন, আমাকে ও আমার পরিবারকে গালাগালি করেছেন তাদের কাছে আমার এই প্রশ্নটা রইলো।

সালমানের মৃত্যুর পর তাঁর দিনগুলো কীভাবে গেছে, সে খবর কেউ রাখেননি। বরাবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর কথায় সবাই তাঁকে দোষী করে গেছেন। সামিরার ভাষায়, ‘ইমন চলে যাওয়ার এক সপ্তাহ পেরোনোর আগেই আমাকে প্রতিদিন ডিবিতে হাজিরা দিতে হতো। এমনটা চলেছে প্রায় তিন মাস। আমার আব্বা উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকতেন, যেন চোখাচোখি না হয়। আর আমি পুলিশ অফিসারের হাজারো প্রশ্নের জবাব দিতে থাকতাম।’

সামিরার মা চীনা বংশোদ্ভূত। তাঁদের বেশ কিছু আত্মীয়স্বজন কলকাতায় আছেন। একটা সময় সামিরাকে তাঁর মা কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

ডিবির প্রতিবেদনে নারাজি দেওয়ায় মামলা সিআইডিতে যায়। সিআইডির তদন্ত শুরু হলে তিনি কলকাতা থেকে ফিরে আসেন। আবারও বসেন পুলিশের মুখোমুখি। সিআইডি সিদ্ধান্ত দেয়, সালমান খুন হননি, আত্মহত্যা করেছেন। এরপর শুরু হয় বিচার বিভাগীয় তদন্ত। পিবিআই গত তিন বছরে বেশ কয়েকবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। যখনই কারও সাক্ষ্য নিয়েছে, তখনই তাঁর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। প্রতি দফায় তাঁকে বসতে হয়েছে কমপক্ষে পাঁচ দিন।

সামিরা হক এখন তিন সন্তানের মা। ’৯৯ সালে দুই পরিবারের সম্মতিতে সামিরা বিয়ে করেন সালমান শাহর বন্ধু মোস্তাক ওয়ায়েজকে। সামিরা জানান, তাঁর বিয়ে করার কোনো প্রস্তুতি ছিল না। দেশের বাইরে চলে যেতে চেয়েছিলেন। ‘ও’ লেভেলের পর তাঁর পড়ালেখা হয়নি সালমানের অনাগ্রহে। তবে এখনো বিড়ম্বনা তাঁর পিছু ছাড়েনি। স্বামীর সঙ্গে কোথাও গেলে অনেকে ফিসফাস করেন।

আইএন

Check Also

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন করোনায় আক্রান্ত সেই কনিকা

অবশেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন করোনায় আক্রান্ত বলিউড প্লেব্যাক গায়িকা কণিকা কাপুর। চলতি সপ্তাহে পরপর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share
Pin