খালেদা জিয়াকে নিয়ে টালমাটাল বিএনপি

বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় দফায় জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং আরও ৬ মাস নতুন জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করে একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হচ্ছে কাল। কিন্তু এই জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন বিএনপির কোন নেতা করেননি বা বিএনপির পক্ষ থেকেও করা হয়নি। এটা করেছে বেগম খালেদা জিয়ার পরিবার থেকে। বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার এই জামিনের আবেদন করেছে।

এই দ্বিতীয় দফা আবেদন মঞ্জুরের মাধ্যমে বিএনপি নতুন করে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়লো বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার মতো একজন নেতা যাকে বিএনপি আপোসহীন নেত্রী বলে সবসময় পরিচয় দিতেন, তার এই আপোস এবং অনুকম্পা ভিক্ষা বিএনপির রাজনীতিতে একটি বড় ধরণের ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে।

এর ফলে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে পুনর্জ্জীবিত হওয়ার যে সম্ভাবনা তা সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়েছে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ খালেদা জিয়া যখন অনুকম্পা ভিক্ষা করে জামিন পান তখন রাজনীতিতে বিএনপির কথা বলা এবং সরকারের বিরোধিতা করার নৈতিক অবস্থান থাকে না। এই কারণেই এখন বিএনপির মধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার জামিন, মুক্তি ইত্যাদি নিয়ে পারস্পরিক বিরোধ-অবিশ্বাস প্রকাশ্য হচ্ছে।

বিএনপির মধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার জামিন এবং মুক্তি নিয়ে তিন রকমের অবস্থান পাওয়া গেছে। বিএনপির একটি ক্ষুদ্র অংশ মনে করছে যে, এটা করা যৌক্তিক। কারণ বেগম খালেদা জিয়া আসলে জেলে যাওয়ার কোন অবস্থায় নেই এবং সরকারের অনুকম্পা বা ভিক্ষা ছাড়া কিছুই করার নেই।

এই বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়ার পরিবার যে আবেদন করেছে সেই আবেদনের মধ্যে তারা কোন দোষ দেখেন না। এটা রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং একটি মানবিক বিষয় বলে মনে করছেন বিএনপির এই ক্ষুদ্র অংশের নেতৃবৃন্দ। যারা এটা মনে করছে তাদের সঙ্গে সরকারের গোপন যোগাযোগ আছে বলেও মনে করেন বিএনপির অনেক নেতাই।

বিএনপির দ্বিতীয় পক্ষ, যারা মনে করছেন এভাবে বেগম খালেদা জিয়ার জামিন অপমানজনক এবং এটা করার দরকার ছিলনা। বরং বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়টি আরো গুছিয়ে আদালত, আন্দোলন অথবা রাজনৈতিকভাবে সরকারের সঙ্গে দেনদরবারের মাধ্যমে করা উচিত ছিল।

বিএনপির একজন নেতা বলেছেন যে, আমরা যখন সরকারের সঙ্গে সংলাপে গেলাম, তখন যদি আমরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিকে শর্ত হিসেবে দিতাম সেটা ভালো হতো। কিংবা পরবর্তীতে সংসদে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সরকারকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির শর্তটি আরোপ করতে পারতাম।

বিএনপির ঐ নেতা আরও বলেছেন যে, বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক সংলাপ হতে পারতো। সংলাপের মাধ্যমে আমরা সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি লাভ করতে পারতাম। তাহলে আমাদের রাজনীতিতে একটি মুখ রক্ষা হতো।

কিন্তু যেভাবে বেগম খালেদা জিয়া অনুকম্পা চেয়েছেন তাতে বিএনপির রাজনীতি অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছে। বিএনপির এই মনোভাব পোষণকারী নেতারা মনে করছেন যে, রাজনৈতিক দলকে পাশ কাটিয়ে পরিবারে পক্ষ থেকে জামিন আবেদনের কোন যৌক্তিক কারণ নেই। কারণ বেগম খালেদা জিয়ার মূল পরিচয় তিনি বিএনপি নেতা।

তিনি একজন সাধারণ ব্যক্তি নন যে, তার পরিবারের সদস্যরা গোপনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করে তার জামিনের জন্যে অনুকম্পা ভিক্ষা করবেন। তবে বিএনপির ঐ অংশের নেতারা মনে করছেন যে, এর মাধ্যমে দলকে খাটো করা হয়েছে এবং দলকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।

বিএনপির তৃতীয় যে পক্ষ, যারা সবথেকে শক্তিশালী, তারা মনে করছেন যে, বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন করাটা ছিল অপ্রয়োজনীয়। দরকার হলে বেগম খালেদা জিয়া জেলেই ত্থাকতেন এবং  বেগম খালেদা জিয়া যদি জেলে থাকতেন তাহলে করোনা সঙ্কটের সময় একটি বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন গঠন করা যেত।

আন্দোলনের মাধ্যমেই বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করাটা ছিল সবচেয়ে যৌক্তিক এবং সেভাবেই বিএনপির প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার ছিল। কিন্তু বিএনপি সে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেনি। যার ফলে এখন বেগম খালেদা জিয়া আর বিএনপির হিসেবে বিবেচিত হলেন না, কারণ তিনি গত ৬ মাস কারামুক্ত জীবনযাপনে দলের কোন খোঁজখবর নেননি এবং দলীয় কোন কর্মকাণ্ড করেননি।

এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, দলের চেয়ে বেগম খালেদা জিয়া নিজেকে বেশি ভালোবাসেন এবং তার মুক্তির বিষয়ে দলের স্বার্থকে দেখা হয়নি এবং দলের স্বার্থ সুরক্ষার কোন পরিকল্পনাও ছিলনা।

এই কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং তারা মনে করছেন যে, বেগম খালেদা জিয়ার এই মুক্তির ফলে সরকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিএনপির দাঁড়ানোর শেষ শক্তিটিও নিঃশেষ হয়ে গেছে।

বাংলা ইনসাইডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.