chaina_4654654845

চীন কেন বিএনপি বিমুখ?

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে বলা হতো ভারতপন্থী। আর বিএনপি’কে বলা হত চীনপন্থী। বিএনপি’র গঠন প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির সঙ্গে চীনের নৈকট্যের ঐতিহাসিক কিছু বাস্তব কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চীন বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশে চৈনিকপন্থী বামরাও এই মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেননি। কোন কোন ক্ষেত্রে এদের একটি অংশ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সমর্থন করেছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ততোটা স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক ছিল না। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে। এই সময়ে ভারতের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত জিয়াউর রহমান চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সেই চেষ্টা করতে থাকেন।

বিএনপি ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি খিচুড়ি দল। এই খিচুড়ি রাজনৈতিক দলটিতে চীনাপন্থীদের বিপুল সমারোহ ছিল। আর সে কারণে ভারতের চেয়ে চীনমুখী নীতি বিএনপির কূটনীতিক কৌশলের একটি বড় দিক ছিল। যখনই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে চীনের সঙ্গে বাড়তি সম্পর্ক করতে কোন রকম কার্পণ্য করে নি।

প্রকাশ্যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক করেছে। কিন্তু ২০০৮ সালের পর আস্তে আস্তে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে থাকেন। বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরের পর এই সম্পর্ক অন্য রকম উচ্চতা পায়।

শুধু মাত্র সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নয়, আওয়ামী লীগের সঙ্গেও চীনের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করার উদ্যোগ নেন শেখ হাসিনা। আর এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে চীন সফরে যাচ্ছে। চীন থেকেও একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসছে।

শেখ হাসিনা খুব নীরবে বাংলাদেশে চীনা কূটনীতির কৌশল পরিবর্তন করেন। শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছিলেন যে, বৈষয়িক এই যুগে চীন অত্যন্ত প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি এবং চীনকে বাদ দিয়ে বড় ধরণের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। আর এই কারণেই তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে ধীরে ধীরে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন রকম অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেন। এখন বাংলাদেশে যে মেগা প্রকল্পগুলো চলছে, সেই মেগা প্রকল্পগুলোর প্রায় সবগুলোতেই চীনের অংশগ্রহণ রয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ চীন সম্পর্কের একটা নতুন মেরুকরণ ঘটেছে।

একইভাবে বিএনপি বাদে যে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো চীনপন্থী ছিল, তারাও এখন ১৪ দলের ছায়াতলে এসেছে। তাদের মধ্যে দিলীপ বড়ুয়ার সাম্যবাদী দল অন্যতম। আর অন্যদিকে বিএনপিতে চীনপন্থী রাজনীতিবিদদের আস্তে আস্তে তিরোধান ঘটেছে বা তাদের দল থেকে চলে যেতে হয়েছে। আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, তরিকুল ইসলাম, সাদেক হোসেন খোকা- এরা সবাই চীনপন্থী বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল।

এরা এখন কেউ নেই। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চীনপন্থী রাজনীতির সঙ্গে থাকলেও সে সময় তিনি উল্লেখ করার মতো কোন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। একজন দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির রাজনীতিবিদ হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন। এই বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতা এখন বিএনপিতে কম।

অন্যদিকে চীনের ক্ষেত্রে যেটি দেখা গেছে, তারা বাণিজ্য করতে চায়। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ক্ষমতায় নেই, বিএনপিতে সুনির্দিষ্টভাবে কোন অর্থনৈতিক নীতি কৌশল নেই। এই কারণেই বিএনপির ব্যাপারে চীনের আগ্রহ নাই। যদিও চীন এখনো বাংলাদেশে সবগুলো রাজনৈতিক দলের সাথে সম সম্পর্ক নীতিতে বিশ্বাস করে। তবুও তারা আদর্শিকভাবে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল থাকার কারণে তারা বিএনপির প্রতি আকৃষ্ট থাকবে তেমনটি এখন দেখা যাচ্ছে না।

এর প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হয়, বিএনপির প্রতি আস্থার অভাব এবং সবচেয়ে বড় বিষয় তারেক জিয়ার নেতৃত্ব। কারণ চীনের সঙ্গে ২০০১ থেকে ’০৬ সালে বিএনপি যে ব্যবসা বাণিজ্যগুলো করতে চেয়েছিল, তার অধিকাংশই বাধাগ্রস্ত হয়েছিল তারেক জিয়ার আর্থিক লোভ এবং টাকা পয়সার হিসাব নিকাশের কারণে।

সেদিক থেকে বর্তমান সরকারের সঙ্গে যখন বাণিজ্য করতে যাচ্ছে চীন। তখন তাদের কোন ঘুষ বা আর্থিক লেনদেনের হিসেব কষতে হচ্ছে না। এটাই চীনের জন্য একটি বিরাট ইতিবাচক দিক। আর এই কারণেই চীন এখন বিএনপি থেকে বিমুখ হয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন কূটনীতিক বিশ্লেষকরা।

সূত্র: বাংলা ইনসাইডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.