kader_mirja_image

অনুসরণ তো আমাদেরই করছেন: কাদেরকে ফখরুল

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সরকারি দলের নেতাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহারের আহ্বান জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘অনুসরণ তো আমাদের করছেন। তাই গালিগালাজ বাদ দিয়ে আসল জায়গায় আসুন।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিএনপি ৮৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব ঘোষণা করলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খুবই কটু ভাষায় আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন এবং প্যাকেজটিকে “কল্পনাবিলাস” বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ পরদিনই প্রধানমন্ত্রী ৭৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দেন। এতে প্রমাণিত হয়, বিএনপির প্রস্তাবটি ছিল বাস্তবভিত্তিক।’

গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বেলা ১১টায় মির্জা ফখরুল ইসলাম এ সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তিনি করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ জোগান দিয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএনপির ৮৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেন।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই দফায় ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার যে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন, তাকে শুভংকরের ফাঁকি বলেছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই বিশাল প্যাকেজের মাত্র ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা প্রণোদনা। বাকি সবটুকুই ব্যাংকনির্ভর ঋণ প্যাকেজ। এতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা, দুস্থ, গরিব, দিনমজুর, শ্রমিকেরা উপকৃত হবেন না।

মির্জা ফখরুল ইসলাম করোনা-দুর্যোগ পরিস্থিতিতেও বিএনপিকে নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের বক্তব্যে উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মন্ত্রীদের বক্তব্যে, আচরণে মনে হয় না তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতিকে সিরিয়াসলি নিয়েছেন, বরং বিএনপি কী করছে না করছে, সেটিই তাঁদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করোনাজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের আবারও প্রস্তাব করেন মির্জা ফখরুল।

মির্জা ফখরুল ইসলাম ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ, পরবর্তী সময়ে ১৩ এপ্রিল ঘোষিত বর্ধিত প্যাকেজ মিলিয়ে ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্যাকেজের বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে দলের পক্ষে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, বরাদ্দ করা ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্যাকেজের মধ্যে ৭৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ। বাজেট ও বিভিন্ন প্রজেক্টের বরাদ্দ থেকে দেওয়া হয়েছে ১৬ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। মূলত বাকি ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সরকারি কোষাগার থেকে।

বিএনপির দাবি, ঘোষিত প্রণোদনার ৭৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার ব্যাংকঋণের বিপরীতে সরকার সুদের ভর্তুকি বাবদ দেবে ৩ হাজার কোটি টাকা। মূলত এই ৩ হাজার কোটি টাকাই হচ্ছে সরকারি প্রণোদনা। এর সঙ্গে ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা যোগ করলে সরকারি প্রণোদনা বা বিশেষ বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪ হাজার ৬০ কোটি টাকা। যদি দাবি করা হয় যে বাজেট বরাদ্দ কিংবা কোনো বিশেষ প্রকল্প থেকে অর্থ দেওয়া হলেও তা সরকারি খাত থেকেই প্রদত্ত। সে ক্ষেত্রেও ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা থেকে ৭৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ বাদ দিলে প্রণোদনা দাঁড়াবে ১৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ। অবশিষ্ট অর্থ সরকারি–বেসরকারি ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বাভাবিক ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিতরণ করবে।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, প্রশ্ন হচ্ছে ব্যাংকগুলো টাকা দেবে কোত্থেকে? নজিরবিহীন লুটপাট, ঋণখেলাপি, সুশাসনের অভাবে ব্যাংকগুলো এমনিতেই তারল্য সংকটে ভুগছে। এর চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই সময়েও ব্যাংকঋণ পাবে সরকারি আশীর্বাদপুষ্ট কিছু নব্য ধনী ও সীমিতসংখ্যক ব্যবসায়ী। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এ ঋণ প্যাকেজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারের উচিত প্রস্তাবিত ঋণ প্যাকেজের জন্য সরকারি তহবিল থেকে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ করা।

বিএনপির এই নেতা বলেন, দিন এনে দিন খায়—এ শ্রেণির দিনমজুর ও অন্যান্য পেশার লোকজনই এই মুহূর্তে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অথচ তাঁদের জন্য সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজে ঘোষণা করা হয়েছে মাত্র ৭৬০ কোটি টাকা, যা নিতান্তই অপ্রতুল। বিএনপি এই খাতে ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করেছে, কারণ এ শ্রেণির গরিব–দুস্থ জনগণই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এবং তাঁদেরই জরুরি আর্থিক সহযোগিতা ও খাদ্যের দরকার। তিনি আরও বলেন, কৃষি খাতে নতুন কোনো বরাদ্দ নেই। কৃষি যন্ত্রপাতি বাদ ২০০ কোটি টাকা এবং কৃষি ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ মূলত বাজেট বরাদ্দেরই পুনঃকথন। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভিজিডি, ভিজিএফ, ওএমএসের ১০ টাকা দরে চাল বিক্রি চলমান প্রক্রিয়া। এর বিপরীতে যথারীতি বাজেট বরাদ্দ রয়েছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, পোশাকশ্রমিকদের বেতন সহায়তার নামে প্রধানমন্ত্রী গার্মেন্টস মালিকদের অনুকূলে বিনা সুদে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিয়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের ঘোষণা দেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিমালা হচ্ছে, ৮০ শতাংশের কম রপ্তানি করে, এ জাতীয় গার্মেন্টস ও শিল্পে কর্মরত শ্রমিক এ সুবিধা পাবেন না। তাহলে অন্যরা কী করবেন? অথচ এই ঋণ প্যাকেজের ঘোষণাই দেওয়া হয় শাটডাউনের পর গৃহবন্দী শ্রমিকদের খাওয়াদাওয়া এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য; যাতে ঘরের বাইরে না আসে, সে জন্য। তিনি বলেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন দিনমজুর, দিন আনে দিন খায় শ্রেণির শ্রমিক, গরিব–দুস্থ জনগণ, কৃষি, মৎস্য, পোলট্রি, ডেইরি, বিধবা, বয়স্ক, স্বামী নিগৃহীতা অসহায় শ্রেণি উপেক্ষিত থেকে যায়। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ঘোষিত নগদ সম্মানী ও বিমার পরিমাণ যথেষ্ট নয় দাবি করে বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলায় প্রথম সারির যোদ্ধা চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের স্বাস্থ্য, জীবনবিমা ও নগদ প্রণোদনা দেওয়া, পিপিই, টেস্টিং কিট ও ভেন্টিলেটর সংগ্রহ, পৃথক করোনা হাসপাতাল, আইসোলেশন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়গুলো সুবিবেচনা পায়নি। গণমাধ্যমের কর্মীরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকদের জন্যও উপযুক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।

চাল চুরির হিড়িক
ত্রাণ বিতরণে নজিরবিহীন দলীয়করণ ও দুর্নীতির ঘটনায় দুস্থ ও অসহায় মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ত্রাণ দেওয়ার ফটোসেশন বা ভিডিও ধারণ করে আবার জোর করে ত্রাণ কেড়ে নেওয়ার চিত্র ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চাল চোরকে বাদ দিয়ে ত্রাণ নিতে আসা লোকদের আসামি করে মামলা করার মতো ঘটনাও ঘটছে।

চাল চুরির এই হিড়িক স্বাধীনতা–পরবর্তী শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের কথা মনে করিয়ে দেয় বলে উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ আবার বলেছিলেন, ‘আমি যা ভিক্ষা করে আনি, সব চাটার গোষ্ঠী খেয়ে ফেলে, আমার গরিব কিছুই পায় না।’

বিএনপির মহাসচিব আবার সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনী তো রাস্তায় আছেই, তাদের ত্রাণ বিতরণে মাঠে নামান।’

এ সময় মির্জা ফখরুল উল্লেখ করেন, বিএনপি গত ২৪ মার্চ থেকে সারা দেশে ত্রাণ বিতরণ করছে। সিলেটে প্রায় ৭০ হাজার পরিবারের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সারা দেশে পাঁচ লাখ পরিবারের মধ্যে বিএনপি ত্রাণ বিতরণ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.