কোন পথে মুক্তি?

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জামিন ইস্যু এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। বাতাসের আগে দৌড়াচ্ছে তার মুক্তি ইস্যু নিয়ে আলোচনা। গতকাল সরকারের চারজন প্রভাবশালী মন্ত্রী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক কারাবন্দি বিএনপি নেত্রীর জামিন ইস্যুতে মন্তব্য করেছেন। কেউ নিজ থেকে বক্তব্য দিয়েছেন আবার কেউ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে জবাব দিয়েছেন।

আজ সোমবার আবারও বেগম জিয়ার জামিনের আবেদন আদালতে করা হবে বলে জানা গেছে। বিএনপি নেত্রীর ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার ১০ ফেব্রুয়ারি বিএসএমএমইউ ভিসি কনক কান্তি বড়–য়া বরাবরে চিঠি লিখে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার ‘অসুস্থতার প্রকৃত তথ্য’ আদালতে তুলে ধরার অনুরোধ করেছেন। বোন সেলিমা ইসলাম ১১ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বন্দি বোনের ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টের সমস্যার চিত্র তুলে ধরে মানবিক কারণ এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য জামিন দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

গতকাল সরকারের প্রভাবশালী চার মন্ত্রীই প্রায় অভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে এখনো কোনো আবেদন করা হয়নি। যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হলে বিবেচনা করা হবে বলেও তারা ইঙ্গিত দেন। বিএনপির একাধিক নেতা গতকালও বলেছেন, সরকার আদালতে প্রভাব না খাটালে বেগম জিয়া এমনিতেই মুক্তি পাবেন।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চলছে তুমুল বিতর্ক। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন কোন পথে বেগম জিয়ার মুক্তি? প্যারলে নাকি স্বাভাবিকভাবে মুক্তি নিয়ে তিনি বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাবেন? কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন সত্যিই কি বেগম জিয়াকে মুক্তি দেয়া হবে?

দীর্ঘ দুই বছর ধরে কারাগারে থাকলেও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য জোরদার আন্দোলন করতে পারেনি বিএনপি। বরং সরকারের অনুমতি নিয়ে তার মুক্তির দাবিতে কয়েকটি সমাবেশ করছে। আদালতে লড়াইয়ের পাশাপাশি দেন-দরবার করছে। জেলে থাকা দলীয় প্রধানের মুক্তির দাবিতে এই ধরনের ‘নরম কর্মস‚চি’ বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা কার্যত এখন তৃণমূলের নেতাদের ‘কাঠগড়ায়’।

১১ ফেব্রুয়ারি পরিবারের সদস্যরা বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা করে অসুস্থতার চিত্র তুলে ধরার পর কয়েকদিন থেকে আবার তাঁর (বেগম জিয়া) মুক্তি নিয়ে কথাবার্তা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। দলীয় নেত্রীর মুক্তির বিষয়ে কথা বলতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফোন করেন ওবায়দুল কাদেরকে। অতঃপর ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘নেত্রীর মুক্তি চেয়ে সরকারের কোনো সাড়া পাইনি’। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়ে পর্দার আড়ালে কিছুই হচ্ছে না’। কিন্তু বাতাসে বেড়াচ্ছে বেগম জিয়ার মুক্তি ইস্যুর খবর।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া সর্বত্রই কথাবার্তা চলছে বেগম জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন কবে? তিনি প্যারলে মুক্তি পাচ্ছেন নাকি এমনিতেই মুক্তি পাচ্ছেন? গতকালও সরকারের চারজন মন্ত্রী ও বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা ‘বেগম জিয়ার মুক্তি’ প্রসঙ্গে কথাবার্তা বলায় ‘বেগম জিয়া জামিন পাচ্ছেন’ খবরের ঢেউ বাতাসে তরঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- সত্যিই কি খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য গত দু’বছর সরকারের ওপর কোনও রকমের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি বিএনপি। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রাস্তার চাপ’ একটি বড় বিষয়। রাস্তায় আন্দোলন করতে না পারলে এ দেশে কোনো রাজনৈতিক অর্জন হয় না। বিএনপি অবস্থা এতো নতজানু যে পুলিশের অনুমতি ছাড়া দুই বছরে নামমাত্র দুইটি সমাবেশ করতে পারেনি। অনুমতি না দিলে বেলুনের মতো চুপ হয়ে যায়। অথচ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে মাঠে নামতে মুখিয়ে রয়েছেন।

এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য মুক্তি চেয়ে পরিবারের সদস্যরা চিঠি দিয়েছেন। এর আগে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চায়। মনে করা হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বেগম জিয়ার জামিন নির্ভর করছে। বিএনপির অভিযোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক কারণে বেগম জিয়ার অসুস্থতার প্রকৃত তথ্য আড়াল করে তাদের নেত্রীকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার ‘খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে আরও উন্নত চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন’ এমন পরামর্শ দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছেন। বিএসএমএমইউ উপাচার্য কনক কান্তি বড়–য়াকে এই চিঠি দেয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। শামীম ইস্কান্দার তার চিঠিতে লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হচ্ছে। যেকোনো ধরনের অপূরণীয় ক্ষতি এড়াতে এখনই আধুনিক সরঞ্জামসহ বিদেশি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা করা দরকার। এজন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। তার পরিবার চিকিৎসার সব খরচ বহন করবে। এর আগে গত ১১ ফেব্রুয়ারি সেলিমা ইসলাম বড় বোন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে এসে বলেছিলেন, ‘বেগম জিয়ার হাত বেঁকে গেছে। তিনি চলাফেরা করতে পারেন না। আমি সরকারকে তার শারীরিক অবস্থা, শ্বাসকষ্টের সমস্যা এবং বয়স বিবেচনা করার আহ্বান জানাচ্ছি। তাকে মুক্তি দেয়া উচিত কিংবা মানবিক কারণে জামিন দেয়া উচিত। অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসা করা না হলে খারাপ কিছু ঘটবে।’

মন্ত্রীরা যা বললেন : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে পর্দার অন্তরালে কিছু হচ্ছে না জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল রোববার সচিবালয়ে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সরকারের বিষয় নয়, এটি আদালতের বিষয়। তবে তারা (বিএনপি) প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করতে পারেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করলে সরকারি বিধিবিধান অনুসারে বিবেচনা করা হবে। তবে পর্দার অন্তরালে কিছু হচ্ছে না। বিএনপি মহাসচিব তাদের চেয়ারপারসনের মুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে ফোন করতেই পারে, এতে লুকোছাপার কিছু নেই। গতকাল কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে এক ইসলামি ইজতেমায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছে সরকার। তার পরিবার কিংবা দলের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে কোনও আবেদন করা হয়নি। আবেদন পেলে সরকার সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। খালেদা জিয়া যদি তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেন, তাহলে সরকার তার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবে। এর আগে শুক্রবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকারের উচিত খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি না করে তাকে মানবিক কারণে জরুরিভাবে মুক্তি দেয়া।

গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শরীরচর্চা কলেজ ময়দানে এক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উদ্বোধন শেষে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, কারান্তরীণ খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে বিএনপি নেতারাই দ্বিধান্বিত। খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে এখনও প্যারোলের কোনো আবেদন করা হয়নি। একদিকে আন্দোলনের ডাক, অন্যদিকে আমাদের সাধারণ সম্পাদককে ফোনে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেবার অনুরোধ করেন। তারা আসলে কী চান, সেটা এখনো স্পষ্ট করতে পারেননি। খালেদা জিয়া শুধু প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলেই সরকারের বিবেচনা করার সুযোগ থাকে। এছাড়া তাকে মুক্তি দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো এখতিয়ার নেই। বিএনপি নেতারা প্রতিদিন খালেদার জামিন নিয়ে কথা বলেন, আর বলেন সরকার বাধা দিচ্ছে। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক সেমিনারে খালেদা জিয়ার প্যারোলের মুক্তির বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন আছে এবং সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা আছে এ পদ্ধতিতে মুক্তির জন্য কোথায় কিভাবে দরখাস্ত করতে হবে। প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি প্রফেশনাল করতে গেলে আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে। তাই প্যারোলে মুক্তির দরখাস্ত এবং সব নিয়মকানুন মানার পরেই সরকার এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত দরখাস্ত পাওয়া না যাবে ততক্ষণ কিছুই করার নেই।

বিএনপি নেতাদের বক্তব্য: খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে বিএনপি নেতাদের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে গতকাল নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির পথে আইনের কোনো বাধা নেই। তাহলে তিনি জামিন তো পেতেই পারেন। কিন্তু সেটাও দেয়া হচ্ছে না। বিএনপি নেতারা কিভাবে বেগম জিয়াকে মুক্ত করবেন। আপনাদের যদি ঐক্যফ্রন্ট ভালো না লাগে, যদি মনে হয় আর কারও দরকার নেই আমরা নিজেরাই পারব তাও ঠিক। কিন্তু বেগম জিয়ার মুক্তি কিন্তু লড়াই ছাড়া হবে না। তার মুক্তির একটাই পথ সেটা হচ্ছে লড়াই। বেগম জিয়ার সুচিকিৎসা ও তার নিঃশর্ত মুক্তি চান। সত্যিই কি আপনারা নিঃশর্ত মুক্তি চান? তাহলে ফোন করলেন কেন? কী কথা হয়েছে ফোনে? তবে বিএনপির স্থানীয় কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপির ঢাকা সিটির কাউন্সিলর প্রার্থীরা শপথ গ্রহণ করেছেন ওয়ার্ড-থানাসহ সকল পর্যায়ে দলকে সুসংগঠিত করে, আরও শক্তিশালী করে আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের নেত্রীকে মুক্ত করবে। আমরা আশা করি, ঢাকা মহানগরী সারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে আজকে প্রস্তুত। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে আমার বিশ্বাস হয় না খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পারব। এটাই বাস্তবতা, এটাই কঠিন সত্যি। বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দলটির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, আমরা ভেদাভেদ ভুলে, ইগো ভুলে, দল ও দলের আদর্শে কাজ করি, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য সারাদেশের নেতারা রাজপথে নামি তাহলে তাকে মুক্তি দিতে সরকার বাধ্য হবে। কিন্তু আমাদের অনেকে মনে করেন, অমুক কাজ করলে আমার কোন দাম থাকবে না, অমুক সফল হলে আমার কি হবে? এভাবে কোন আন্দোলন সফল হবে না। একজন কর্মীও যদি সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে তার নেতৃত্বেই আন্দোলন করা উচিত। সকলে মিলে মিশে আন্দোলন করতে পারলেই খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন।

উৎসঃ   ইনকিলাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.