আদালতের রায়ে কি বিএনপি নিষিদ্ধ হবে?

‘২১ আগস্ট মামলার রায় হচ্ছে, এজন্য সবাই খুশি। বিএনপিই কেবল অখুশি। সেপ্টেম্বরে রায় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ কথা শুনে বিএনপি চিন্তিত। তারা জড়িত বলে তাদের এই গাত্রদাহ।

কারণ রায় বের হলে তারা নতুন করে সংকটে পড়বে।’ ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত আইভি রহমানের কবরে আজ শুক্রবার সকালে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সাংবাদিকদের কাছে একথা বলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের ওই বক্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে নানা রকম আলোচনা হচ্ছে।

সবারই প্রশ্ন নতুন করে কোন সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশে অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল দাবি করা বিএনপি। এই বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে বাংলা ইনসাইডার। এতে উঠে যে তথ্য উঠে এসেছে তা বিএনপির জন্য সত্যিই সংকটের।

যুদ্ধাপরাধ বিচারে মতিয়র রহমান নিজামী, দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী, আলী আহসান মুজাহিদ, মীর কাসেমসহ জামাতের নেতাদের বিরুদ্ধে রায়ের সময় আদালতের পর্যবেক্ষণে বারবার একটি কথা উঠে এসেছিল, তা হলো, জামাত যুদ্ধাপরাধীদের একটি সংগঠন। এই পরিপ্রেক্ষিতে জামাত নিষিদ্ধের জন্য সুপারিশ করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধের ঘটনার সঙ্গে জামাত সাংগঠিনকভাবে জড়িত ছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম নৃশংস ঘটনা হলো ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। ভয়াবহতম এই হামলায় নিহত হন ২৩ জন। আহত শতাধিক। ১৪ বছর আগের এই ঘটনার মামলার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে। আগামী মাসেই এ মামলার রায় হতে পারে ধারণা করা হচ্ছে।

এখন আইনঙ্গ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যে যুক্তিতর্ক চলছে সেখানে বলা হয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রত্যক্ষ মদদে ও হস্তক্ষেপে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ঘটিয়েছিল। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করেছে বিএনপি। মামলার যুক্তিতর্কের রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলীরা বারবার বলেছেন, রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে হামলার দায় বিএনপি কখনোই এড়াতে পারে না। এই হামলার দায় বিএনপিকে নিতে রাজনৈতিক দল হিসেবেও। আর এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে বিএনপির রাজনীতিই হলো সন্ত্রাসবাদের রাজনীতি। বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে বিএনপি। রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলীরা এই যুক্তি তুলে ধরেছেন।

এর আগে কানাডার একটি আদালত দুটি মামলার রায়ে বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রায় দুটিতে দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিল। আদালতে তারা বলেছিল বিএনপির সমর্থক হওয়ায় দেশে তাঁদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন করা হয়। এজন্যই তারা রাজনৈতিক আশ্রয় চায়। কিন্তু কানাডার আদালত বলেছে, বিএনপিই একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। অবশ্য কানাডার আদালতে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয়ে রায় বাংলাদেশে প্রভাব ফেলবে না। তবে নিজ দেশের আদালতে রায়ে কোনো রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষিত হওয়া বিশেষ গুরুত্ববহ।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এর আগে পৃথিবীর অনেক দেশে রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী সংগঠন, গণবিরোধী সংগঠন বা নির্বাচনের অযোগ্য সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি দলকে জামার্নিসহ সারা পৃথিবীতেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই ভাবে নিষিদ্ধ হয়েছে ইতালির মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দল।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার যুক্তিতর্কে বারবার উঠে এসেছে বিএনপি যে রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে এর কারণেই তারা এমন হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারাই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। যুক্তিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায়ে বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আদালতের রায় হতে পারে বেলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা, যেমনটি হয়েছে কানাডার আদালতে। কানাডার আদালতে নিষিদ্ধ হওয়া বাংলাদেশে কার্যকর না। কিন্তু বাংলাদেশের আদালত বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা বা বিএনপি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল প্রমাণিত হলে দলটির নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যে রাজনীতি করছে, এজন্য যেসব সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে তাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের যথেষ্ট উদাহরণ আছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াতে ইসলামীকে সাংগঠনিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একাত্তরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে জামাতের ওপর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই ভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ভয়াবহতম হত্যাকাণ্ড, ২৩ জনকে হত্যার ঘটনায় কোনো সংগঠন সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হতেই পারে বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বাংলা ইনসাইডারকে বলেন, ‘বিএনপি সংগঠন হিসেবে ২১ হামলার জন্য দায়ী এমন যুক্তিতর্ক নিম্ন আদালতে হয়েছে।‘ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের বহু দেশেই দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক দল যদি এর গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি বিরুদ্ধ আচার আচরণ করে তাহলে সেই রাজনৈতিক দলটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে অযোগ্য হয়ে যেতে পারে। সবকিছু বিচার বিবেচনা করে মহামান্য আদালত যদি দেখেন বিএনপি সাংগঠনিকভাবে এবং এর শীর্ষ নেতারা হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাহলে আদালত এমন কোনো পর্যবেক্ষণ দিতেই পারেন যে, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন।’

এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী শ ম রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গ্রেনেড হামলার সঙ্গে সাংগঠিনিক ভাবে বিএনপির যদি সম্পর্ক থাকে এবং সেটি যদি আদালতে প্রমাণ করতে পারেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা, তাহলে বিএনপির বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, যুদ্ধাপরাধী মামলার রায়ে জামাতকে বলা হয়েছিল, একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে জামাত সাংগঠিনভাবে জড়িত এবং জামাত যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত। সে কারণেই নিষিদ্ধ হয়েছে তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে যদি বিএনপির সংশ্লিষ্টতা যদি প্রমাণিত হয় এবং আদালতে যদি বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে তাহলে সেটি হবে নজিরবিহীন এক ঘটনা। নির্বাচনের আগে এমন ঘটনায় দেশের বর্তমান রাজনীতিতে এক নতুন বাঁক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.