সরকার চালাচ্ছে বিএনপি?

বিএনপিতে সিদ্ধান্ত নেয় কে?-এটাই এখন দলটির নেতা-কর্মীদের বড় প্রশ্ন। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে। কারাগার থেকে তাঁর দল চালানোর সুযোগ নেই। ৮ ফেব্রুয়ারি কারান্তরীণ হওয়ার পর মাত্র একবার নেতাদের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। কাজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া লন্ডনে পলাতক। তাঁর মা গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রথম ক’দিন দলের সঙ্গে ভালোই যোগাযোগ রাখছিলেন। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, ততই তাঁর যোগাযোগ শিথিল হয়ে গেছে।

বিএনপি নেতারাই বলেন, এগারো বছরে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে গেছে, এটাই তারেক বুঝতে চান না। একজন নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশে গত এক দশকে পরিবর্তনগুলোর কারণে, তারেকের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত বাস্তবতা বিবর্জিত।’ এ কারণেই সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা এখন গৌণ।

বেগম জিয়ার আত্মীয় স্বজন, বিশেষ করে তাঁর ছোট ভাই এবং বোন এক সময় বিএনপিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করতো। তবে, বেগম জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁদের কার্যক্রম এখন মুক্তি কেন্দ্রীক। শামীম ইস্কান্দার সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং দেন-দরবার করছেন। এই দেন-দরবার কেবলই বেগম জিয়ার মুক্তি কেন্দ্রিক।

পরিবারের বাইরে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক সংস্থা দলের স্থায়ী কমিটি। স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য অসুস্থ, মৃতদের শূন্যপদ পূরণ করা হয়নি। ২০১৬’র কাউন্সিল থেকেই দুটি পদ খালি। প্রায় অর্ধেক এই স্থায়ী কমিটিরও প্রথম দিকে তৎপরতা থাকলেও ক্রমশ: সিনিয়র নেতারা ঝিমিয়ে পড়ছেন। বৈঠক, কর্মসূচি নির্ধারণে তাঁদের আগ্রহ নেই বললেই চলে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির দুটি বৈঠক ডেকেও তা বাতিল করা হয়েছে। বৈঠক বাতিলের প্রধান কারণ সিনিয়র নেতাদের অনাগ্রহ। স্থায়ী কমিটির বাইরে রয়েছে দলের কার্যনির্বাহী কমিটি। বেগম জিয়া গ্রেপ্তার হবার আগে ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারারুদ্ধ করা হলে আবার স্থায়ী কমিটি বসবে।

কিন্তু তেমন বৈঠকের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে, বিএনপি চালানোর সব দায়িত্ব এসে বর্তেছে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপর। কিন্তু যাঁরা বিএনপি মহাসচিবকে দীর্ঘদিন চেনেন, তাঁরা জানেন, একলা এত বড় দল চালানোর মত নেতা তিনি নন। মির্জা ফখরুলও বিভিন্ন নেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে কর্মসূচি নির্ধারণ করছেন।

কিন্তু দলের একাধিক সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরামর্শের চেয়ে মির্জা ফখরুল বরং মতামত নিচ্ছেন। যেমন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদকে সম্প্রতি তিনি ফোন করে বলেন, ‘আমাদের তো ২২ মার্চ সমাবেশ করতে দিলো না, আমি আবার ২৯ মার্চ তারিখ দিচ্ছি, কি বলেন?’ বিএনপির একজন নেতা বলেন,‘ফখরুল বললেন না যে ২২ মার্চ তো সমাবেশ করতে দিলো না, এখন কি করি?’

উদাহরণ আরও আছে, ২৬ মার্চ রাতে বিএনপির মহাসচিব ফোন করলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে। বললেন,‘ আমাদের তো জনসভা করতে পুলিশ অনুমতি দিলো না। ভাই কাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা দরকার। আপনি যান সঙ্গে হাফিজ সাহেব আর আলতাফ সাহেবকে দেই।’ নজরুল ইসলাম খান মনে করেছিলেন, এই সিদ্ধান্তটা বোধ হয় লন্ডন থেকে এসেছে।

তাই তিনি কোন প্রশ্ন না করেই রাজি হয়ে যান। পরে জানলেন, এটা মির্জা ফখরুলের একক সিদ্ধান্ত। কিন্তু নজরুল ইসলাম খান সচিবালয়ে গিয়ে দেখলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রস্তুত। তাহলে বৈঠকের অ্যাপয়নমেন্ট ঠিক করল কে ?’ যেমন ২০ দলের বৈঠক ডাকা হলো,  বৈঠকে মির্জা ফখরুল বললেন,‘ আমি ব্যস্ত তাই নজরুল ভাই এখন সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।’ সবাই অবাক হলেও মেনে নিলো। কিন্তু তাতে  ২০ দলের গুরুত্ব কমে গেল। সবাই ধারণা করেছিল সিদ্ধান্ত বোধহয় তারেক দিয়েছে। কিন্তু তারেক জিয়াই ফোন করে দুই নেতার কাছে ‘সমন্বয়ক’ পরিবর্তনের কারণ জানতে চান।

বিএনপিতেই তাই প্রশ্ন উঠেছে, এই সিদ্ধান্তগুলো কে নিচ্ছে। কার এজেন্ডা  বাস্তবায়ন করছেন মির্জা ফখরুল?’ অনেকেরই ধারণা, সরকারই চালাচ্ছে মির্জা ফখরুলকে। সরকার যে কর্মসূচি দিতে বলছে সেটাই তিনি ঘোষণা করছেন। এ পর্যন্ত তাঁর  সিদ্ধান্তের যাঁরা বিরোধিতা করেছে,তারা নাটকীয় ভাবে গ্রেপ্তার হয়েছে। তাই এনিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতেও রাজি নয়।

‘তারেকের জন্যই কিছু হচ্ছে না’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক জিয়াকে দেশে আসার সুযোগ দিলেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে- এমন মত দিয়েছেন বিএনপি নেতা আবদুল আওয়াল মিন্টু। আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার কাছে গত মঙ্গলবার মিন্টু এই প্রস্তাব দিয়েছেন। সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এ খবর নিশ্চিত করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেগম জিয়ার মুক্তি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সরকার এবং বিএনপির মধ্যে নানা পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। বেগম জিয়া মুক্তি পেলে নির্বাচন পর্যন্ত সময় দেশের বাইরে থাকবেন, এ ব্যাপারে মোটামুটি ঐক্যমত হয়েছে প্রধান দুই দলের। বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনেও আপত্তি নেই বিএনপির। আবার নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

কিন্তু সমঝোতার পুরো প্রক্রিয়া আটকে গেছে তারেক জিয়ার প্রসঙ্গে। বিএনপি চায় নির্বাচনের পর বেগম জিয়ার সঙ্গে ফিরুক তারেক জিয়াও। তারেক জিয়া দেশে ফিরলে তাঁকে যেন ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) দেওয়া হয়। কিন্তু এব্যাপারে সরকারের অবস্থান এখনো কঠোর। বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা বলেছেন ‘তারেক জিয়াতেই থমকে আছে সমঝোতা।’ তাঁর মতে, ‘তারেকের জন্যই কিছু হচ্ছে না, না আন্দোলন না সমঝোতা।’

‘বিএনপি কি আপনার পৈতৃক সম্পত্তি?`

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়না দীর্ঘদিন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই-একজনকে নিয়ে দল চালাচ্ছেন। তাঁর অধিকাংশ সিদ্ধান্তই দলের সিনিয়র নেতাদের অগোচরে হচ্ছে। সিনিয়র নেতারা জানছেন, ঘটনা ঘটার পর।

যেমন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গেই দেখা যায়, সিনিয়র নেতারা ছিলেন অন্ধকারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস টেলিভিশনে প্রথমে দেখেন যে তারই দলের তিন নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। টেলিভিশনে এটা দেখেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মির্জা আব্বাস। টেলিফোন করেন বিএনপির মহাসচিবকে। জিঙ্গেস করেন, ‘বিএনপি কি আপনার পৈতৃক সম্পত্তি? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেখা করতে গেলেন কার পারমিশনে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তো আমাদের অনেক ইস্যু। গুম, হত্যা গ্রেপ্তার অনেক কিছু। আপনি তো দালালি করে সব কিছু জায়েজ করে দিলেন।’ মির্জা ফখরুল কিছু বলাই আগেই ফোন কেটে দেন মির্জা আব্বাস। শুধু মির্জা আব্বাস নয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও চটেছেন স্থায়ী কমিটির বাইরে দলীয় সিদ্ধান্তের ঘটনায়। তিনি দ্রুত স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

বাংলা ইনসাইডার

Check Also

‘হাজী’ পরিবারের বিস্ময়কর উত্থান

পিতার দুই সংসারের দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান তিনি। অভাব-অনটনে বেড়ে ওঠা। অর্থভাবে লেখাপড়া করতে পারেননি। কিশোর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share
Pin