moududh_ahmedh

দুজন আর্মি অফিসার এসে আমাকে বলল ‘সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ রাষ্ট্রপতি হতে চান’

ওয়ান ইলেভেনের সময় আমাকে বাসা থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে একটি অন্ধকার রুমে রাখা হয়। যেখানে আমার সঙ্গী ছিল টিকটিকি, পিঁপড়া আর মশা। ওখানে আমাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়। যা এখানে আমি বলব না। তবে আমার পরবর্তী বইয়ে এ বিষয়ে লিখব।

আজ মঙ্গলবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় বিশেষ জজ আদালত ৫-এর বিচারক ড. আখতারুজ্জামানের আদালতে এসব কথা বলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

মওদুদ আহমদ আদালতে বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সময় আমাকে বাসা থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে একটি অন্ধকার রুমে রাখা হয়। যেখানে আমার সঙ্গী ছিল টিকটিকি, পিঁপড়া আর মশা। ওখানে আমাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়। যা এখানে আমি বলব না। তবে আমার পরবর্তী বইয়ে এ বিষয়ে লিখব।

একদিন দুজন আর্মি অফিসার এসে আমাকে রুমের বাইরে নিয়ে বলল, আপনি আমাদের আইনি সহযোগিতা করেন। আমি বললাম কী সহযোগিতা? তারা বলল, আমাদের সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ রাষ্ট্রপতি হতে চান। আমি বললাম কীভাবে? এটা তো সম্ভব নয়। এটা করতে হলে তো আপনাদের মার্শাল ল’ জারি করতে হবে। কারণ তিনি মঈন ইউ আহমেদ তো সরকারি একজন কর্মচারী। তখন তারা বলল, দুই নেত্রীকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে এবং তারা সেই চেষ্টা করেছিল।

মওদুদ আহমদ আরো বলেন, ‘মাইনাস টু ফর্মুলা করে ফখরুদ্দীন ও মইন উ আহমেদ ক্ষমতায় এসে দুই নেত্রীকে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া সেই সমঝোতায় আসেননি। শেখ হাসিনা ঠিকই সমঝোতা করে বিদেশে চলে গেলেন। পরে বলা হলো, তাঁরা রাজি না হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। পরে ফখরুদ্দীন-মঈন ইউ আহমেদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তারা ১৪টি মামলা দিয়ে ১১ মাস কারাগারে রেখেছিলেন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চারটি মামলা দিয়ে ১২ মাসের বেশি সময় কারাগারে রাখা হয়েছিল।

আমাদের সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন তৈরি করা হয়। এ আইনকে ধ্বংস করেছে মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার। তারা এ আইনের অপব্যবহার করে। এ আইন দিয়ে এখন সাধারণ মানুষকেও হয়রানি করা হয়। দুদককে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাদের হাইকোর্টের বিচারপতিদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অথচ তারা এ মর্যাদার অপব্যবহার করছে। এটা কি রাম রাজত্ব যা ইচ্ছে তাই করব?’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রচলন বেগম খালেদা জিয়া করেছেন। তৎকালীন বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা এর জন্য আন্দোলন করেছিলেন। অনেক ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করেছিলেন। অনেক মানুষ নিহত হয়।

আদালতে মওদুদ বলেন, ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় এই মামলার কোনো কাগজে উনার (খালেদা জিয়ার) সই নেই। ঘষামাজা করে এই মামলার বিচার কাজ চলছে, আসলে এভাবে মামলাটি চলতে পারে না। আজকে যে আইনে বিচার চলছে, এই আইনটি হচ্ছে আমাদের (বিএনপি) সময় করা। এই আইনটি অনেক গবেষণা করে আমরা করেছিলাম। কিন্তু আমরা দেখি এই আইনটি প্রয়োগ করা হয় শুধু বিরোধী দলের জন্য।’

মামলার কার্যক্রমকে ক্যামেরা ট্রায়ালের সঙ্গে তুলনা করে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এখানে আইনজীবীদের জন্য কোনো বসার ব্যবস্থা নেই, এখানে নির্যাতনমূলক বিচার হচ্ছে বলে আমি মনে করি। কারণ এখানে অনেক আইনজীবী আসতে পারেন না, সাধারণ মানুষও আসতে পারে না। এরপরও এখানে খালেদা জিয়ার আরো ১৪টি মামলা স্থানান্তর করা হয়েছে। আমরা হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগে যখন মামলা পরিচালনা করি তখন বিচারক এবং আইনজীবীদের দূরত্ব থাকে আট ফিট। কিন্তু এখানে দূরত্ব ১০০ ফিটেরও বেশি। আপনাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য এতটা দূরত্ব রাখা হয়েছে যা কোনোভাবেই ঠিক নয়। মামলার শুনানিরও ভালো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।’

সর্বশেষে আদালতকে উদ্দেশ করে খালেদা জিয়ার এই আইনজীবী বলেন, ‘এতদ্বারা আপনি এই মর্মে উপসংহারে আসবেন যে সম্মানের সহিত খালেদা জিয়াকে খালাস দেবেন।’

এরপর অ্যাডভোকেট সানাউল্ল্যাহ মিঞা আদালতে আগামী তিনটি কার্যদিবসে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত হাজিরা ও স্থায়ী জামিনের আবেদন করেন। তিনি আদালতকে বলেন, ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক অসুবিধার কারণে খালেদা জিয়া আগামী দুদিন তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থিতি থেকে অব্যাহতি চান। তিনি খালেদা জিয়ার স্থায়ী জামিনও প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, এর আগে আদালত খালেদা জিয়ার অস্থায়ী জামিন মঞ্জুর করেছিলেন। সে স্থলে স্থায়ী জামিনের আদেশ দেওয়া হোক।

ওই সময় এর বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। এর আগে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না মর্মে হাইকোর্ট থেকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা একটি আদেশ আনেন। সেই আদেশ উল্লেখ করে মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, এই মামলার সমস্ত কার্যক্রম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে পরিচালনার জন্য হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে তাঁকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তি আছে।

উভয়ের শুনানির পর খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি এবং স্থায়ী জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে দেন আদালত।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত এক কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি। জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১০ সালের ৮ আগস্ট জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের নামে তেজগাঁও থানায় দুর্নীতির অভিযোগে এ মামলা করেছিলেন দুদকের সহকারী পরিচালক হারুন-অর-রশিদ।

এ মামলার অপর আসামিরা হলেন—খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

উৎসঃ   এনটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.