rong_ni

সরফুদ্দীনের আয় বেড়েছে তিন গুণ, মোস্তাফিজারের কমেছে

রংপুর সিটি করপোরেশনের বিদায়ী মেয়র সরফুদ্দীন আহমেদের গত পাঁচ বছরে আয় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। এবার ২১ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও মেয়র পদে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছেন। অপর দুই বড় দলের প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির কাওসার জামানের আয় ও ব্যাংকঋণ—দুটোই বেড়েছে প্রায় ১২ গুণ। আর জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমানের আয় কমে হয়েছে তিন ভাগের এক ভাগ। ২০১২ ও ২০১৭ সালে মেয়র পদপ্রার্থীদের দেওয়া নির্বাচনী হলফনামা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

 আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদের পাঁচ বছর আগে বাৎসরিক আয়, ব্যাংক ও নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ৪৫ লাখ ৪ হাজার ৯৮১ টাকা। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩০ লাখ ৮৫ হাজার ১৬৮ টাকা।

মেয়র থাকা অবস্থায় সম্পদ বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সরফুদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার যা সম্পদ আছে তা সবই বলেছি। ছোট ছোট কিছু ব্যবসা আছে বলেই গত পাঁচ বছরে টাকার পরিমাণ বেশি হয়েছে। এটা তো হতেই পারে।’

সরফুদ্দীন আহমেদের আয়-ব্যয়ের বিবরণীতে বলা আছে, বার্ষিক আয় ৪৫ লাখ ৯৩ হাজার ১৪০ টাকা। এর মধ্যে মেয়র সম্মানী ১১ লাখ ৪ হাজার, নির্ভরশীলের ভবন ভাড়া থেকে ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৬৪০ টাকা আয় করেন। নির্ভরশীলের চাকরি থেকে ১৩ লাখ ৩৩ হাজার, ছাত্রাবাস ভাড়া থেকে পান ৭৫ হাজার টাকা, স্ত্রীর ব্যবসা থেকে ৫ লাখ ৭১ হাজার, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাবদ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ টাকা আয় করেন।

এ ছাড়া তাঁর নামে ব্যাংকে জমা আছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৪ টাকা, স্ত্রীর নামে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৬২ টাকা এবং ছেলের নামে ৫ লাখ ২৩ হাজার ৩৩৮ টাকা। শেয়ার হিসাবে নিজ নামে আছে ১৪ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৩ টাকা এবং নির্ভরশীলের নামে আছে ৫ লাখ টাকা। পোস্টাল ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আছে নিজের নামে ২ লাখ, নির্ভরশীলের নামে ১৭ লাখ টাকা।

তাঁর নিজ নামে নগদ আছে ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫৭ টাকা এবং স্ত্রীর নামে আছে ১৬ লাখ ২৭ হাজার ৩৮ টাকা। নির্ভরশীলের নামে ৮৪ হাজার ৩৬৬ টাকা।

সম্পদের ক্ষেত্রে ছেলের নামে আছে একটি প্রাইভেট কার। সেই সঙ্গে নিজ নামে ২ ভরি ও স্ত্রীর নামে ৬ ভরি এবং ছেলের নামে ১৩ ভরি সোনা রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে বাণিজ্যিক ভবন ও একটি তিনতলা বাড়ি। তাঁর নিজস্ব কোনো কৃষিজমি নেই। তিনি নিজেকে বি কম পাস বলে উল্লেখ করেন।

বিএনপির প্রার্থী

হলফনামা থেকে জানা যায়, বিএনপির প্রার্থী কাওসার জামানের বিভিন্ন খাত থেকে বাৎসরিক আয়, নগদ ও ব্যাংকে জমানো টাকার পরিমাণ পাঁচ বছর আগে ছিল ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৩ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া পাঁচ বছর আগে তাঁর ব্যাংকে ঋণ ছিল ৪ কোটি টাকা। এখন এই ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৫০ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাওসার জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ব্যাংকঋণ থাকলেও তা চলমান। আর বিভিন্ন ব্যবসা ও আয়ের উৎস থেকে টাকার পরিমাণ বেড়েছে। এ ছাড়া জুট মিল রয়েছে। যৌথ ব্যবসায় সাত পরিচালক রয়েছেন। তাই ঋণের পরিমাণ এত বেশি।’

কাওসার জামান হলফনামায় বলেছেন, নিজ নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ঋণ আছে ৮ কোটি এবং যৌথ নামে সোনালী ব্যাংকে ঋণ ৪২ কোটিসহ মোট ৫০ কোটি টাকা। তাঁর বার্ষিক মোট আয় ১৫ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাত থেকে ৫০ হাজার, বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে ২ লাখ ৪ হাজার, ব্যবসা থেকে ১৩ লাখ টাকা আয় করেন। এ ছাড়া ব্যাংকে জমা আছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। নগদ টাকা আছে ২ লাখ। সম্পদের মধ্যে আছে দুটি জিপ, একটি প্রাইভেট কার, দুটি ফ্ল্যাট, একটি বাড়ি ও দুই ভরি সোনা। কৃষিজমি আছে ২ হাজার ৭৫০ একর। অকৃষি জমি ১ দশমিক ৪ একর। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস।

জাতীয় পার্টির প্রার্থী

জাতীয় পার্টির মেয়র পদপ্রার্থী মোস্তাফিজার রহমানের বাৎসরিক আয়, নগদ ও ব্যাংকে জমানো টাকার পরিমাণ পাঁচ বছর আগে ছিল ৪২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪৫ টাকা। বর্তমানে তা কমে হয়েছে ১৪ লাখ ৪ হাজার ২৭২ টাকা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যবসা ভালো না হওয়ার কারণে আয় কমে গেছে।

 মোস্তাফিজারের জনতা ব্যাংকে ঋণ আছে ১৫ লাখ টাকা। নিজ নামে নগদ আছে ৭ লাখ ৫০ হাজার, স্ত্রীর নামে ২০ হাজার টাকা। ব্যাংকে নিজ নামে আছে ১ লাখ ৫০ হাজার, স্ত্রীর নামে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তাঁর বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৬৪ হাজার ২৭২ টাকা। এর মধ্যে বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে ৭২ হাজার এবং ব্যবসা থেকে ২ লাখ ৯২ হাজার ২৭২ টাকা আয় দেখানো হয়েছে।

তাঁর সম্পদের মধ্যে আছে একটি মোটরসাইকেল, স্ত্রীর কেনা ১০ ভরি সোনা। এ ছাড়া নিজ নামে ১৬ শতক এবং স্ত্রীর নামে ৬ শতক জমি আছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস।

আইন অনুযায়ী, হলফনামায় দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বা কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা অনুসন্ধান করে ভুল তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে নির্বাচন কমিশন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে নির্বাচিত হওয়ার পর মেয়র পদ বাতিলও হতে পারে।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মহানগর কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম প্রথম আলোকে বলেছেন, বিএনপির প্রার্থী যেহেতু একজন শিল্পপতি, সে ক্ষেত্রে তাঁর আয়ের ফারাক হতেই পারে। কিন্তু এরপরও এত বিপুল টাকা আয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ক্ষেত্রে আয়ের তথ্য এই পাঁচ বছরের ব্যবধানে বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেহেতু তাঁর তেমন একটা ব্যবসা নেই, এ কারণে তাঁর আয় আগের থেকে কিছুটা বেশি মনে হয়। আর জাতীয় পার্টির প্রার্থী যেহেতু ব্যবসা করেন, সে ক্ষেত্রে আয়-ব্যয় ওঠানামা করতেই পারে।

ছয় স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল

১৩ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ছয়জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা যাছাই-বাছাইয়ের পর বাতিল হয়েছে। বিধি অনুসারে প্রতি মেয়র প্রার্থীকে ৩০০ ভোটারের নাম-ঠিকানা স্বাক্ষরসহ জমা দিতে হবে। এসব প্রার্থীর দেওয়া ভোটারের নাম-ঠিকানা ভুয়া হওয়ার কারণে তাঁদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়।

বাতিল হওয়া ছয় স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন: রংপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র এ কে এম আবদুর রউফ, আবদুল মজিদ (বীরপ্রতীক), সাবেক ক্রিকেটার শাকিল রায়হান, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নাজমুল ইসলাম, মেহেদী হাসান এবং একমাত্র নারী প্রার্থী সুইটি আঞ্জুম।

এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেন আওয়ামী লীগের সরফুদ্দীন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান, বিএনপির কাওসার জামান, বাসদের আবদুল কুদ্দুস, ইসলামী আন্দোলনের এ টি এম গোলাম মোস্তফা, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সেলিম আখতার, স্বতন্ত্র ও জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার।

এ ছাড়া কাউন্সিলর পদে ২২৬ জনের মধ্যে ৮ জন ও সংরক্ষিত আসনে ৬৭ জনের মধ্যে ৪ জন প্রার্থীর তথ্যে অসংগতি থাকায় প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। এখন ৩৩টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী থাকলেন ২১৮ জন এবং সংরক্ষিত আসনে ৬৩ জন। ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার, ৪ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ এবং ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

প্রথম – আলো

Check Also

‘হাজী’ পরিবারের বিস্ময়কর উত্থান

পিতার দুই সংসারের দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান তিনি। অভাব-অনটনে বেড়ে ওঠা। অর্থভাবে লেখাপড়া করতে পারেননি। কিশোর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share
Pin