যেভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো ইমাম আবু হানিফাকে!!

জন্ম ও বংশ পরিচয়

ইমাম আজমের পূর্ব পুরুষরা আদিতে কাবুলের অধিবাসী হলেও ব্যবসায়িক সূত্রে তারা কুফাতে নিবাস গড়েন। তার পিতা সাবিত ছিলেন একজন তাবেয়ি। প্রসিদ্ধ মতানুসারে তিনি ৬৯৯ ঈসায়ি সালের ৫ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ৮০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার মূল নাম ছিল নোমান। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আবু হানিফা উপনামে সুখ্যাতি লাভ করেন।

শিক্ষাজীবন

বিখ্যাত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হওয়ায় ইমামে আজম ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। লেখাপড়ার প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু ১৯ বা ২০ বছরের দিকে ইমাম শাবীর (রহ.) নজরে পড়েন তিনি। ইমাম শাবী (রহ.) তাকে ডেকে দ্বীনী জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করেন। শাবীর ক্ষণিকের সান্নিধ্য তার জীবনের মোড় বদলে দেয়।

তিনি জ্ঞানার্জনের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহী হয়ে উঠেন। ব্যবসার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে জন্মভূমি কুফার বড় বড় শায়েখদের থেকে জ্ঞানার্জন করতে থাকেন। তিনি বিশেষভাবে ইমাম হাম্মাদের শিষ্যত্ব বরণ করেন। ইমাম হাম্মাদ হলেন ইবরাহিম নখঈ’র প্রিয় ছাত্র। আর ইবরাহিম ইবনে নখঈ (রহ.) হাদিস শাস্ত্র ও ইলমে শরিয়ত শিক্ষা লাভ করেছিলেন হজরত আলী (রা.) এবং হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে।

ইমাম হাম্মাদ একাধারে বিশ বছর পরম যত্নের সঙ্গে মেহনত করে নোমান ইবনে সাবিতকে ইমামে আজমরূপে গড়ে তোলেন। ইমাম আজম শুধু কুফার প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস ও ফকিহদের জ্ঞানভান্ডারের ওপর সন্তুষ্ট না থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য হারামাইন শরিফাইন ভ্রমণ করেন। ১৩০ হিজরি থেকে ১৩৬ হিজরি পর্যন্ত একটানা ৬ বছর হারামাইন শরিফাইনে অবস্থান করে সেখানকার বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে হাদিস আহরণ করেন। ঐতিহাসিকদেরর মতে তিনি প্রায় চার হাজার মুহাদ্দিস থেকে হাদিস শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

কর্মজীবন

যেভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো ইমাম আবু হানিফাকে

১২০ হিজরিতে উস্তাদ হাম্মাদের ইন্তেকালের পর তিনি উস্তাদের মাদ্রারাসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাঠদানের পাশাপশি পৈতৃক কাপড়ের ব্যবসাও ধরে রেখেছিলেন।

তাবেয়ি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন

ইমামে আজম (রহ.) আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সান্নিধ্য ধন্য বেশ কয়েকজন সাহাবির সঙ্গলাভ করে তাবেয়ি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. (৯৩ হি.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আউফা রা. (৮৭ হি.), হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. (৮৮ হি.) হজরত আবু তুফাইল রা. (১১০ হি.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইদি রা. (৯৯ হি.), হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. (৯৪ হি.) ও হজরত ওয়াসেনা ইবনে আসকি রা. (৮৫ হি.)।

জীবনচিত্র

আল্লাহতায়ালা ইমাম আবু হানিফাকে অতুলনীয় জ্ঞান দান করেছিলেন। তিনি প্রচুর পরিমাণে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। তিনি প্রায় ৫৫ বার হজব্রত পালন করেন। আদায় করেন অসংখ্য ওমরা। প্রতি রমজানে অসংখ্যবার কোরআন খতম করতেন। কথিত আছে, তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছর এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ পড়েছিলেন।

ব্যবসায়ী কার্যক্রমে কোনো লেনদেনের ব্যপারে সামান্যতম সন্দেহ দেখা দিলে সে লেনদেনের সম্পূর্ণ অর্থ দান করে দিতেন। সততা ও নৈতিকতা ছিল তার ব্যবসার মূলভিত্তি। উপার্জিত সম্পদের বৃহৎ একটি অংশ জনসেবায় খরচ করতেন।

অবদান

পাঠদানের দীর্ঘ জীবনে অসংখ্যা ছাত্রকে ফকিহরূপে তৈরি করেছেন। তদানীন্তন সময়ের বিশাল মুসলিম সম্রাজ্জের প্রায় সব শহরের বিচারপতির আসন তার ছাত্ররা অলঙ্কৃত করেছিলেন। তার প্রিয় ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ছিলেন প্রধান বিচারপতি।

ইমাম আবু হানিফার রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মুসনাদে আবু হানিফা, আল ফিকহুল আকবার, ওয়াসিয়াতু আবু হানিফা ও কিতাবুল আসার।

গবেষকদের মতে তিনি চল্লিশ হাজার হাদিস থেকে বাছাই করে কিতাবুল আসার সঙ্কলন করেছিলেন। তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো কোরআন ও হাদিস থেকে জনসাধারণের আমল উপযোগী মাসয়ালা বের করার মূলনীতি দাঁড় করানো। তার সম্পাদিত এ শাস্ত্রের নাম উসূলুল ফিক্হ। এ কাজের জন্যই তিনি ইমামে আজম খ্যাতি লাভ করেন। তার প্রণীত ফিকাহ আমাদের কাছে ফিকহে হানাফি নামে পরিচিত।

মৃত্যু

খলিফা মনসুর তাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি জালেম শাসকের সমর্থনের দায় এড়ানোর জন্য এ পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। এতে অপমানে ক্ষুব্ধ হয়ে খলিফা ইমাম আবু হানিফাকে কারাগারে বন্দী করেন। প্রতিদিন তাকে কারাগার থেকে বের করে প্রকাশ্যে দশটি করে চাবুক মারা হতো। চাবুকের আঘাতে তার শরীর থেকে রক্ত বের হতো। সে রক্তে কুফার মাটি রঞ্জিত হতো। পানাহেরর কষ্টসহ বিভিন্নভাবে সত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধ ইমামকে নির্যাতন করা হয়। অবশেষে জোর করে বিষ পান করানো হয়। ৭৬৭ ঈসায়ি সালের ১৪ জুন মোতাবেক ১৫০ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের নিয়ামত দানে ধন্য করুন। তার রেখে যাওয়া আদর্শের ওপর আমাদের জীবন পরিচালিত করার তওফিক দান করুক।

আমিন।

পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণে প্রিয়নবির ৫ উপদেশ!!

মৃত্যু একটি সুনিশ্চিত এবং নির্ধারিত বিষয়। কোনো কিছুর জন্ম অনিশ্চিত হলেও জন্মের পর তাঁর মৃত্যু সুনিশ্চিত। মানুষ এ কথা জানা সত্ত্বেও মৃত্যুর ব্যাপারে গাফেল হয়ে আছে। একজন মুসলিমের প্রধান কাজ হলো মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা। কারণ মৃত্যুর স্মরণই মানুষকে সব সময় ভালো কাজের প্রতি পরিচালিত করে।

কিন্তু মানুষের মৃত্যু কখন হবে এ ব্যাপারে মানুষের কোনো ধারণা নেই। তাইমানুষের জন্য করণীয় হলো সব সময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। আর মৃত্যু আসার আগে পরকালের পাথেয় সংগ্রহে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ৫টি উপদেশ মেনে চলা জরুরি।

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের পূর্বে মূল্যবান মনে কর। আর তাহলো-

>> মৃত্যুর আগে তোমার (দুনিয়ার) জীবনকে মূল্যবান মনে কর;

>> অসুস্থ্য হওয়ার আগে সুস্থতাকে মূল্যবান মনে কর;

>> ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে অবসরকে মূল্যবান মনে কর;

>> বৃদ্ধ হওয়ার আগে যৌবনের সময়কে মূল্যবান মনে কর;

>> অভাব বা দারিদ্র্যতার আগে স্বচ্ছলতা বা প্রাচুর্যকে মূল্যবান মনে কর। (মুসনাদে আহমদ)

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বিখ্যাত হাদিস মানুষের জীবন চলার গতিকেই পরিবর্তন করে দেয়। পথহারা মানুষ পায় সঠিক পথের দিশা। এ হাদিসের আলোকেই মানুষ কবরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে বেশি।

কারণ এ পাঁচটি অবস্থা মানুষের জীবনকালের সঙ্গে সম্পর্কিত। যারা পরকালের চিন্তাভাবনা করে তখন তারা এ বিষয়গুলো চিন্তা করে পরকালীন জীবনের জন্য পাথেয় সংগ্রহে গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করে।

মনে রাখতে হবে-

কোনো মানুষই মৃত্যুর পর দুনিয়ায় তার রেখে যাওয়া কোনো সম্পদই নিয়ে যেতে পারবে না। শুধু তা-ই নয়, মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আমল করার সুযোগেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। তাই মৃত্যুর আগে হায়াতে জিন্দেগিকে মূল্যবান মনে করার প্রতি তাগিদ দিয়েছেন প্রিয়নবি।

ইবাদত বন্দেগির জন্য মানুষের সুস্থতা প্রয়োজন। এ কারণে হাদিসে পাকে সুস্থতাকে মূল্যবান মনে করার ব্যাপারে তাগিদ দেয়া হয়েছে। যাতে মানুষ সুস্থ অবস্থায় কুরআন-সুন্নাহর বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে পারে।

মানুষ যখন কর্ম ব্যস্ততা থেকে অবসর হয়, তখনই আল্লাহর ইবাদত বন্দেগিতে নিজেকে নিয়োজিত করা উচিত। যদিও আল্লাহর নামে করা প্রতিটি কাজ এবং ব্যস্ততাও ইবাদতে শামিল। তথাপিও আল্লাহ তাআলা কর্তৃক কিছু ফরজ কাজ রয়েছে; যেগুলো যথা সময়ে আদায় করতে হয়। যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি বিধানাবলী।

নামাজের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা না থাকলে তা যথা সময়ে আদায় করে নেয়া। এভাবে রোজার জন্য সেহরি গ্রহণে অলসতা না করে যথা সময়ে তা গ্রহণ করা। এভাবে প্রতিটি কাজই ব্যস্ততার আগে অবসরকে মূল্যবান মনে করার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন প্রিয়নবি।

মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে যৌবন কালে। সে সময় মানুষ বিভিন্ন কারণে বিপথগামী হয়। এ কারণে আল্লাহ তাআলার কাছে যৌবন কালের গুরুত্ব বার্ধক্যের তুলনায় অনেক বেশি।

অর্থ সম্পদ বা প্রাচুর্যকে দুনিয়ার সব অনর্থের মূল বলা হয়ে থাকে। তথাপিও ইসলামে সম্পদ বা স্বচ্ছলতার গুরুত্ব অনেক বেশি। মানসিক প্রশান্তির জন্য স্বচ্ছলতা অনেক বেশি প্রয়োজন।

স্বচ্ছল ব্যক্তি সম্পদহারা হয়ে গেলে অনেক অন্যায় কাজে ধাবিত হয়। চারিত্রিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অস্বচ্ছলতা আসার আগে স্বচ্ছলতাকে মূল্যবান মনে করতে তাগিদ দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহ উল্লেখিত হাদিসের ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Check Also

biye

ইসলামে স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করার পূর্বে স্বামীর মৃত্যু হলে কী করনীয়?

দেনমোহর কী : বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেনমোহর প্রদান করতে হবে, এটা স্বামী কর্তৃক প্রদেয় স্ত্রীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share
Pin